ফ্রি এনার্জি কি আসলেই ফ্রি?

5
2064
Self Flow Flask - ফ্রি এনার্জি কি আসলেই ফ্রি?

ইদানীং তরুণ সমাজের মাঝে ফ্রি এনার্জি নিয়ে দারুণ উৎসাহ উদ্দিপনা দেখি। বিজ্ঞান প্রেমী হোক বা সাধারণ মানুষ, সবার কাছেই একি কথা, ফ্রি এনার্জি কি ভাবে পাই?? যে ভাবে বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ছে!

(ফ্রি এনার্জি মেশিন বলতে এখানে Perpetual Motion Engine/ Free running engine বোঝানো হয়েছে যা কিনা ব্যহ্যিক কোনো শক্তি ছাড়াই নিজের উৎপন্ন শক্তি দিয়েই চলে ও সাথে অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালানোর উপযুক্ত শক্তি সরবরাহ করতে পারে)

  • (১) একটা ব্যাটারি দিয়ে মোটর চালাবো। আবার সেই মোটরের সাথে একটা ছোট জেনারেটর থাকবে। যা কিনা বিদ্যুৎ তৈরি করবে মোটর ঘুরবার সাথে সাথে। আবার সেই জেনারেটর থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ কে আবার ব্যাটারি তে দেয়া হবে। অথবা,
  • (২) কোনো ম্যাগনেট কে কয়েলের চারিপাশে ঘোরানো হবে। তাতে কয়েলে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে তা দিয়ে আবার একটা ছোট মোটর বা ইলেকট্রিকাল ম্যাগনেট কে চালানো হবে।

ইত্যাদি ইত্যাদি বিভিন্ন উপায় বাৎলানো আছে যা ইউটিউব ঘাটলে পাওয়া যায়। সেদিন তো শুনলাম আমাদের দেশেও নাকি কোন কম্পানি এক বিশেষ তৈরি করেছে যার ব্যাটারি সারা বছরে মাত্র এক বার চার্জ দিলেই বাকি ৩৬৪ দিন চলবে! নলকূপ চেপেও নাকি ব্যাটারি চার্জ দেয়া যাবে এমন খবর ও শুনতে পেলাম!

বাহ, বাহ, বেশ;
জ্ঞানে বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ(!)

ভাবতে ভালোই লাগে।

তবে আমি ঐ সব গুরু তত্ত্ব কথা- কিভাবে হয়, কেন হয় বা হয়না- তার ভেতরে যাবো না। আমার শুধু একটা প্রশ্ন জাগে মনে যে ফ্রি এনার্জি যদি করা হয় তা কি আসলেই ফ্রি হবে? নাকি তা ফ্রি থাকা সম্ভব?? শুধু উৎপাদনের দিক থেকে নয় বরং বিলি বন্টনের দিক থেকে চিন্তা করলে?

আসুন একটু ভাবি। আর আমাদের কল্পনার ঘোড়া গুলোর লাগাম ছেড়ে দেই।

ধরুন, আজকে ভোরে স্বপ্নে এমনি একটা যন্ত্র দেখলাম। আর সকালেই কাজে লেগে তা বানিয়েও ফেল্লাম! বাহ! মহা ক হয়ে যাওয়ার খুশিতে আমি আত্মহারা। ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস ও দিয়ে দিলাম যে আমি অমুক পদ্ধতিতে ফ্রি এনার্জি করেছি। বেলা গড়িয়ে দুপুর হবার আগেই আমার ইনবক্স আর ফোনের জ্বালায় ও ফেসবুক কোম্পানি দিশেহারা কি ভাবে কি সামাল দেবে! এর পর শুরু হলো আসল ঝামেলা!

বেলা গড়িয়ে দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ আর তেলের ব্যবসায়ী সকল যোগাযোগ করতে শুরু করল- “তোমার জিনিস আমার কাছে বেচে দাও”। ধরে নিলাম আমি মহৎপ্রাণ। এই  সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেবো এই উদ্দেশ্যে কাজ করছি। তাই স্বভাবতই কারো কাছে বিক্রি করবো না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই বিখ্যাত কোনো এক পাওয়ার প্ল্যানট এর প্রতিনিধি হাজির এবং তাকেও সসম্মানে একই উত্তর দিয়ে ফিরিয়ে দেয়ার পর আমার অবস্থা কি হতে পারে?

একটু সহজ ভাবে ভাবি চলুন, ধরুন আপনি এক জন ব্যবসায়ী। আপনার কাজই হচ্ছে আপনার উৎপাদিত পণ্য সবার মাঝে পৌঁছে দেয়া। অবশ্যই টাকার বিনিময়ে। এমনকি আপনার অনেক নামডাক ও আছে যে আপনি  সৎ ব্যবসায়ী। তো যখন আপনি শুনবেন যে অমুক এলাকার এক ছেলে এই জিনিস  করছে তখন কি হবে? আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে সবাই আপনার পণ্য না কিনে ঐ ছেলের কাছ থেকে জিনিস টা নিয়ে ব্যবহার শুরু করুক? নিজের ব্যবসার ক্ষতি কেই বা চায় বলুন! কেউ কেউ একটু চিকন বুদ্ধি সম্পন্ন। তারা মুখে “ছেলেটার পাশে দাঁড়াই, ছেলেটা কত ভালো, এগিয়ে যাও ভায়া আমি তোমার জন্য আছি” ইত্যাদি বিভিন্ন কথাবার্তা বলবেন। তাও আসলে নিজের ব্যবসা ঠিক রাখবার জন্যই।

উপরন্তু যদি এমন হয় যে আমি (ঐ ছেলে) সেই একদম উন্মুক্ত করে দিলাম। যার খুশি সেই বানিয়ে ব্যবহার করুক তখন?? আপনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে! হায় হায়, ঐ ছেলের কাছ থেকে সবাই সেই মেশিন নিয়ে ব্যবহার শুরু করে দিলে তো আপনার উৎপাদিত বিদ্যুৎ আর লসেও বিক্রি করতে পারবেন না!

সহজ কথায় সেই ছেলে আপনার ব্যবসার বারোটা নয় আঠারো টা বাজিয়ে ছাড়বে! আপনি যদি খুব ভালো মানুষ হন তাহলে সে ছেলের কাছে গিয়ে অনুরোধ করবেন যেন তার টা আপনার কাছে বিক্রি করে দেয়। যদি দেয় তাহলে তো আপনি কোটি পতি থেকে লক্ষ কোটি পতি হয়ে যাবেন বলাই বাহুল্য! আর ঐ এক কালিন টাকা দিয়ে সেই ছেলে যেখানে ছিলো সেখানেই ফিরে যাবে। আচ্ছা এমন যদি হয় যে সে ছেলে আপনার
কাছেও বেচলো আবার আপনার বিপরীত ব্যবসায়ীর কাছেও বেচলো তখন? তখন আপনার টাকা গুলোই শুধু জলে যাবে! কারণ ফ্রি এনার্জি
আর কত দামেই বা বেচবেন বলেন? অবশ্য এসব ঝামেলা না করেও কাজ হাসিল করতে পারেন আপনি!

কিভাবে?

কিছুই না, শুধু ঐ ছেলে কে ধরে একটা ভূয়া কেস এ জড়িয়ে তার চৌদ্দ গুষ্ঠি কে ঘোল খাওয়াবেন! তখন সে ছেলে কই যাবে হারায়ে— তার জীবন আর পরিবার নিয়েই তখন সংশয়ে কাটবে! তখন কই সময় পাবে এই সব জনদরদী গবেষণার! আবার তাকে ব্রেন ওয়াশের চেষ্টাও করতে পারেন! ভুলিয়ে ভালিয়ে তার যন্ত্র তাঁকে দিয়ে বানিয়ে, দিতে পারেন লাথি!

আর হয়তো আপনি ভালো মানুষ। এমন কিছু করবেনই না কিন্তু আপনার সাথের ব্যবসায়ীরা যে করবে না তার গ্যারান্টি কিন্তু নেই। আচ্ছা মনে করুন আপনি সেই ক আর আপনি ব্যবসাও বেশ ভাল বোঝেন। তো আপনি করলেন কি আপনার আবিষ্কৃত যন্ত্রটি স্বল্প মূল্যে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে বাজারে ছেড়ে দিলেন। অবশ্যই সবার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে দাম ধরলেন। আবার অন্য উৎপাদকদের সাথে পাল্লা দিতে আর তাদের চক্ষুশূল না হতে দামটাও রাখলেন তাদের সাথে মিলিয়ে বা কিছু কম! তখন কি হবে?
হেহে, বাঙ্গালি অনেক বুদ্ধিমান প্রাণি। তা না হলে ধোলাইখাল আর ফুটপাথে চাইনিজ কম্পানির তৈরি বাংলা ভার্শন বালু ভরা পাওয়ার ব্যাংক বা গাড়ির দুই নাম্বার পার্টস পাওয়া যেতো না!
সহজ কথায় ২ দিনের মাথায় তার ডুপ্লিকেট বের হবেই! তখন আপনার এই ফ্রি এনার্জি মেশিন রাস্তায় বিক্রি হবে। তাও আপনার চেয়ে কম দামেই!
আমি পেলেও বানাতাম, ফ্রী এনার্জি বলে কথা!

তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই ফ্রি এনার্জি আছে, তা হলেও দেখা যাচ্ছে ফ্রি এনার্জি নিয়ে যতোই হাঙ্কিপাঙ্কি হোক, তা আদতে আসলে ফ্রিই থাকছে না!

সারা দুনিয়ার বৈশ্বিক পাওয়ার/তেল এনার্জি সঙ্কটে এগুলো ফ্রি নামে শুধু লোকের চোখে আগের দিনে প্রচলিত ভানুমতী’র খেল বা হাত সাফাই ছাড়া আর কিছুই নয়!

পরিশিষ্টঃ

আমাদের চেনা বিজ্ঞান ও এর আবিষ্কৃত সকল যন্ত্রপাতি যে সকল সূত্রানুসারে চলে তাতে এখন পর্যন্ত এমন যন্ত্র করা সম্ভব হয়নি। কারণ তা শক্তির নিত্যতা সূত্রকে লঙ্ঘন করে। ক্ষেত্র বিশেষে পরীক্ষকের ভূল, যন্ত্রের পারিপার্শ্বিক অবস্থা এমন ফলাফলের জন্য দায়ী। আর বাস্তবতার নিরিখে এটি হলেও তা আদতে ফ্রি থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

ঘুরে আসুন আমাদের ইলেকট্রনিক্স শপ থেকেঃ
ঘুরে আসুন আমাদের ইলেকট্রনিক্স শপ থেকেঃ
ঘুরে আসুন আমাদের ইলেকট্রনিক্স শপ থেকেঃ
ঘুরে আসুন আমাদের ইলেকট্রনিক্স শপ থেকেঃ
শেয়ার
পূর্ববর্তী নিবন্ধএল ই ডি বা লাইট ইমিটিং ডায়োড
পরবর্তী নিবন্ধওহম এর সূত্র – একটি বৈজ্ঞানিক সূত্রের অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ
facebook-profile-picture
ব্যবহারিক ইলেকট্রনিক্স, এনালগ ইলেকট্রনিক্স, নেটওয়ার্কিং, ফটোগ্রাফি, গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করি। মূলত ডেভলপমেন্ট রিলেটেড কাজই বেশী করা হয়। লেখালিখির একটা ঝোঁক আছে তবে অনেক সময় নিয়ে লিখতে হয়।লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট করবার পর ব্যক্তিগত জীবনে সফটওয়্যার ও আইটি সংক্রান্ত পেশায় ছিলাম বহু বছর। ইলেকট্রনিক্স ও ফটোগ্রাফি আমার আজন্ম একটি হবি ও সাধনা। তবে এখন খুব কম এসব নিয়ে ব্যবহারিক কাজ করা হয়। বেশীরভাগ সময় এখন আমাদের ইলেকট্রনিক্সের পেছনেই ব্যয় হয়।

5 টি কমেন্ট

  1. হ্যা, কই মাছের তেল দিয়ে যদি কই মাছ ভাজা যায়– তাহলে ফ্রি এনার্জি বলতে যা বুঝায়, অনেকটা এইরকম ই—

  2. ইউটিউবে ফ্রি এনার্জির যে সকল ভিডিও দেখি, যেমন দুটো মটর দিয়ে অথবা তামার তার পেচিয়ে তাতে চুম্বক ব্যবহার করে ভোল্টেজ উৎপন্ন করে এগুলো সবই কি ভুয়া ?? প্লিজ জানাবেন।

কমেন্ট প্রদান

Please enter your comment!
Please enter your name here