সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার তৈরি করুন নিজেই

3
145
সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার তৈরি করুন নিজেই
সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার তৈরি করুন নিজেই

চৈত্রের মাঝামাঝি সময়, আবহাওয়া ক্রমশ উষ্ণতর হয়েই চলেছে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে একটু সুখের আশায় সিলিং ফ্যানের নিচে বসেও শান্তি মেলে না। লোডশেডিং, মুহূর্তেই ফ্যানকে গতিশূন্য করে দেয়। ইহা আমার একার সমস্যা নয়। ইহা বাঙালি জাতির জাতীয় সমস্যা। এ কারনেই ইদানীং গ্রুপে ডিসি ফ্যান নিয়ে অনেক পোষ্ট/ কমেন্ট দেখতে পাচ্ছি। কীভাবে কম খরচে মোটর দিয়ে DC চার্জার ফ্যান তৈরি করা যায়। কিভাবে ব্যাটারির ব্যাকাপ টাইম বাড়ানো যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই এই গরমে দীর্ঘ সময় শীতল থাকার উপায় হিসেবে, আপনাদের উদ্দেশ্যে ছোট্ট একটি উপহার নিয়ে এসেছি- সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার  (৫৫৫ আইসি দিয়ে PWM ডিসি ফ্যান রেগুলেটর)

মোটর স্পিড কন্ট্রোলার নিয়ে জরুরী কিছু কথা

এই মোটর স্পিড কন্ট্রোলার প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা শুরুর পূর্বে কিছু প্রয়োজনীয় কথা বলা প্রয়োজন। বাজারে বিভিন্ন সাইজের, বিভিন্ন ভোল্টেজের DC ফ্যান কিনতে পাওয়া যায়। ফ্যানগুলির সাথে ছোট একটি মোটর স্পিড কন্ট্রোলার দেয়া থাকে ফ্যানকে Slow/ Fast করার জন্য। আমরা অনেকেই ভেবে থাকি Slow মোডে অনেক বেশি সময় ফ্যানটি চলবে। ব্যাকাপ টাইম বেশী পাওয়া যাবে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তেমনটি ঘটেনা, উল্টো অনেক কম সময়েই ব্যাটারি ডিসচার্জ হয়ে যায়/ব্যাকাপ টাইম খুবই অল্প হয়। এর প্রধান কারন হচ্ছে, মোটর SLOW করার জন্য কন্ট্রোলার বক্সে সাধারনত 5W থেকে 10W এর একটি রেজিস্টর সিরিজে দেয়া থাকে। যা SLOW মোডে অত্যধিক গরম হয়ে ব্যাপক পাওয়ার লস করে। তাই ব্যাকাপ টাইম কমে যায় এবং এ পদ্ধতি ব্যাটারির লাইফটাইমও কমিয়ে দেয়। তাই মোটর কন্ট্রোলের জন্য রেজিস্টরের ব্যাবহার মোটেই ভালো নয় / কার্যকর পদ্ধতি নয়।

মোটর কন্ট্রোলের জন্য PWM রেগুলেটরের সুবিধা/ গুণাবলি

মোটর স্পিড কন্ট্রোলারের প্রত্যেকটি কম্পোনেন্টের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। যা কোনও পাওয়ার লস করেনা বললেই চলে।

  • এ পদ্ধতিতে ব্যাটারির লাইফটাইমে কোনও প্রভাব পড়েনা এবং স্লো মোডে ব্যাকাপ টাইম বেশি পাওয়া সম্ভব হয়
  • হাই কারেন্ট রেটিং এর মসফেট ব্যবহারের ফলে বেশি ওয়াটের মোটর কন্ট্রোল করা যায়
  • ভেরিয়েবল পটের সাহায্যে যেকোন মাত্রায় মোটর চালানো সম্ভব হয়
  • সবগুলো কমন কম্পোনেন্ট এবং দামেও সস্তা, তাই সহজে প্রস্তুত করা যায় এবং নির্মাণ ব্যায়ও কম

PWM সম্পর্কিত কিছু কথা

PWM এর পূর্ণরূপ হচ্ছে “Pulse Width Modulation”। যার অর্থ “সংকেতের বিস্তৃতির সামঞ্জস্যবিধান”। অর্থাত, যে পদ্ধতিতে আউটপুট সংকেতের স্থায়িত্বের নিয়মনীতির ওপর নির্ভর করে কোনও ডিভাইসকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাকে PWM পদ্ধতি বলা হয়।

PWM একধরনের সংকেত বা পালস যা নির্ধারিত সময় পরপর হাই (5V/6v/12v) এবং লো (0V) হিসেবে পরিবর্তিত হতে থাকে। সংকেতের High অবস্থার সময়সীমাকে “ON Time” এবং LOW অবস্থার সময়সীমাকে OFF Time বলা হয়।

PWM তরঙ্গ যেভাবে কাজ করে

PWM এর ডিউটি সাইকেল/Duty Cycle

শতকরা যতভাগ সময় PWM সংকেত High অবস্থায় থাকে তাকে ডিউটি সাইকেল বলা হয় । যদি আউটপুট সংকেত সর্বসময় High অবস্থায় থাকে তাহলে সেটা হবে 100% ডিউটি সাইকেল । আবার যদি আউপুট সংকেত সর্বসময় Low অবস্থায় থাকে তাহলে সেটা হবে 0% ডিউটি সাইকেল ।

Duty Cycle = Turn ON time ÷ (Turn ON time + Turn OFF time)

PWM এর ফ্রিকোয়েন্সি/ তরঙ্গ

PWM কত দ্রুত একটি পরিপূর্ণ সংকেত কার্য সম্পন্ন করতে পারে তা ফ্রিকোয়েন্সি/তরঙ্গের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। একটি পরিপূর্ণ সংকেত কার্য সম্পন্ন হয় একটি ON Time এবং একটি Off Time এর সমন্বয়ে।

PWM এর বাস্তব উদাহরন

একটি LED কে যদি এক সেকেন্ডের মধ্যে ০.৫ সেকেন্ড ON এবং ০.৫ সেকেন্ড OFF রাখা হয়, তাহলে আমাদের চোখ এই LED এর জ্বলা নেভার তারতম্যকে খুব সহজেই বুঝতে পারবে। কিন্তু যদি LED কে ১ সেকেন্ডে ৫০ বার ON, OFF করা হয় তাহলে খালি চোখে LED টি সর্বদা জ্বলে আছে বলেই মনে হবে।

এক্ষেত্রে প্রতি সেকেন্ডে ৫০% সময় ON থাকার কারনে LED টি অর্ধেক উজ্জ্বলতায় জ্বলছে বলে মনে হবে। একইভাবে প্রতি সেকেন্ডে LED কে 60%, 70%, 80% সময় ON রাখা হলে আলোর উজ্জ্বলতা সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পাবে ।

একই ভাবে এই মোটর স্পিড কন্ট্রোলার টিতেও এই ON, OFF পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

মোটর স্পিড কন্ট্রোলার এর সার্কিট ডায়াগ্রাম

নিচে সার্কিট ডায়াগ্রাম দেয়া হলো। এটি তৈরিতে ASM Shamim Hasan ভাই অনেক সাহায্য করেছেন। তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার এর সার্কিট ডায়াগ্রাম
সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার এর সার্কিট ডায়াগ্রাম

উল্লিখিত 555 আইসির PWM যেভাবে কাজ করে

উল্লিখিত ডায়াগ্রামের আউটপুট PWM সংকেতের ফ্রিকোয়েন্সিকে 100K ভেরিয়েবল রেজিস্টর এবং 0.1uf সিরামিক ক্যাপাসিটররের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। 100K ভেরিয়েল রেজিস্টরের মান পরিবর্তনের মাধ্যমে আউটপুটে ডিউটি সাইকেল পরিবর্তন হবে। ডায়াগ্রামের 1N4148 ডায়োড দুটির মাধ্যমে 0.1uf ক্যাপাসিটর চার্জ/ ডিসচার্জ হবে ফলে পালস্/ সংকেত তৈরি হবে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি হচ্ছে-

  • ভেরিয়েবল রেজিস্টরের মান যত কমিয়ে রাখা হবে, ক্যাপাসিটর তত দ্রুত চার্জ হবে এবং ডিসচার্জ হতেও একটু বেশি সময় নেবে। এ কারনে আউটপুট ON Time Width বেড়ে যাবে এবং OFF Time Width কমে যাবে।
  • ভেরিয়েবল রেজিস্টরের মান যত বাড়িয়ে দেয়া হবে, ক্যাপাসিটর তত ধীরে চার্জ হবে এবং দ্রুত ডিসচার্জ হবে। এ কারনে আউটপুটের ON Time Width কমে যাবে এবং OFF Time Width বেড়ে যাবে।

এ পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে চলতে থাকার কারনে আউটপুট ডিভাইস অনবরত ON, OFF এর মধ্যদিয়ে নির্ধারিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রিত হবে।

555 আইসির অন্যান্য ডায়াগ্রামের সাথে আমারটির পার্থক্য

পোষ্টকৃত মোটর স্পিড কন্ট্রোলার ডায়াগ্রামের আউটপুট সাইড খেয়াল করলে আপনারা দেখতে পাবেন, এখানে মসফেটটি ড্রাইভ করার জন্য দুটো ড্রাইভার ট্রানজিস্টর BC547(NPN) এবং BC557(PNP) ব্যবহার করা হয়েছে। বেশিরভাগ ডায়াগ্রামে আইসি হতে সরাসরি মসফেট ড্রাইভ করানো হয়। কিন্তু একটি সূক্ষ্ম সমস্যা রয়েই যায় তা হলো, ভিন্ন ভিন্ন মসফেট ড্রাইভের জন্য আলাদা মাত্রার Gate Voltage & Current এর প্রয়োজন হয় যা 555 আইসি সকল ক্ষেত্রে দিতে পারেনা। ফলে খুব সহজেই আইসিটি নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা থেকে যায়।

তাই অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার ভোল্টেজ এবং কারেন্ট এ ড্রাইভ হতে পারে এমন ট্রানজিস্টর এর সাহায্যে যদি মসফেট ড্রাইভ করানো হয় তাহলে আইসি, ট্রানজিস্টর এবং মসফেট সবকিছু সুরক্ষিত থাকবে এবং অধিক টেকসই হবে। পরীক্ষামূলক ভাবে আমি সরাসরি আইসি থেকে মসফেট ড্রাইভ করে আশানুরূপ ফলাফল পাইনি এবং আইসি নষ্ট হয়েছে। তাই অবশেষে ড্রাইভার ট্রানজিস্টর যুক্ত করে কাজ সম্পন্ন করেছি। ড্রাইভার ট্রানজিস্টর ব্যবহার করতে Asm Shamim Hasan ভাই আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ।

  • অপেক্ষাকৃত শার্প রেজাল্ট পাওয়ার জন্য মসফেটের গেট থেকে গ্রাউন্ডে একটি 10K রেজিস্টর দিয়ে GATE কে Pull Down করে রাখা হয়েছে।
  • ট্রানজিস্টর বায়সিং এর জন্য 10K এবং মসফেট সুইচিং এর জন্য 330 ওহম ব্যবহার করা হয়েছে।
  • পাওয়ার ইনপুটে একটি প্রটেকশন ডায়োড দেয়া হয়েছে যাতে ভুলবশত উল্টোভাবে পাওয়ার ইনপুট করলেও ডিভাইসের ক্ষতি না হয়।

আমার তৈরি সহজ ডিসি ফ্যান স্পিড কন্ট্রোলার

নিচে আমার তৈরি সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার বা ডিসি ফ্যান স্পিড কন্ট্রোলারের চিত্র দেখতে পাচ্ছেন-

ভেরো বোর্ডে আমার তৈরি সহজ মোটর স্পিড কন্ট্রোলার
আমার তৈরি ডিসি ফ্যান, মোটর স্পিড কন্ট্রোলার এর সামনের ও পেছনের চিত্র
আমার তৈরি ডিসি ফ্যান স্পিড কন্ট্রোলার এর সামনের ও পেছনের চিত্র

পরিশেষে সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই সবাইকে আমার এ লেখাটি পড়বার জন্য। তৈরি করুন সহজ মোটর ফ্যান স্পিড কন্ট্রোলার আর তীব্র গরম থেকে বাঁচুন।

3 মন্তব্য

  1. স্পিড কমাতে রেজিস্টর ব্যবহার করলে ব্যাকাপ টাইম কমে যায় বা ব্যাটারির লাইফটাইম কমে যায়, এটা মোটেও ঠিক নয়। রেজিস্টর ব্যবহার করলে টোটাল পাওয়ার কনজাম্পশন অবশ্যই কমবে, ফলে অবশ্যই ব্যাকাপ টাইম বাড়বে। কিন্তু পাওয়ার বা এনার্জি যেটুকু খরচ হবে, তার পুরোটুকু ব্যবহার উপোযোগী হবেনা। কিছু অংশ রেজিস্টরে তাপ হিসেবে অপচয় হবে, বাকিটা ব্যবহার করা যাবে।
    ধরুন, আগে মাসে দশ টাকার খাবার কিনতেন, এখন মাসে পাচ টাকার খাবার কেনেন, আর দুই টাকা ভিখিরিকে দেন। তাহলে বর্তমানে মোট খরচ সাত টাকা যা অবশ্যই আগের মাসের চেয়ে কম, যদিও আপনার কাজে লেগেছে মাত্র পাচ টাকা, বাকিটা অপচয়। ব্যাপারটা অনেকটা এমন।

  2. একটি মোটরকে সিরিজ রেজিস্টরের সাহায্যে একটি নির্দিষ্ট স্পিডে চালানো হলে যতটুকু ব্যাকাপ পাওয়া যাবে, সমপরিমাণ স্পিডে মোটরটি pwm পদ্ধতিতে চালানো হলে তার চেয়ে অবশ্যই রেজিস্টরের তুলনায় বেশি সময় ব্যাকাপ পাওয়া সম্ভব। মূলত এখানে pwm এর সাথে রেজিস্টরের তুলনামূলক বিচারে কথাগুলো বলা হয়েছে । সেইমভাবে রেজিস্টরের সাহায্যে দীর্ঘদিন একটি মোটর চালানো হলে যতখানি পাওয়ার তাকে আউটপুট হিসেবে দিতে হবে সেই তুলনায় pwm পদ্ধতিতে সেইম স্পিডে কম পরিমানে পাওয়ার আউটপুটে দেয়ার প্রয়োজন পড়বে ফলে তুলনামূলক বিচারে ব্যাটারি কম চাপে থাকবে এবং ব্যাটারির লাইফটাইম বেশি হবে।(যদিও ব্যাটারির লাইফটাইম প্রপারলি চার্জ, কাটঅফ এবং লোকাট অফ ইত্যাদি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে) পোষ্টে কথাগুলো সরাসরি বলার কারনে মনে হচ্ছে যেন সম্পূর্ণ দায়টা রেজিস্টরের ওপর পড়েছে… মূলত তুলনামূলক হিসেবেই কথাগুলো বলা হয়েছে। পাঠকের সুস্পষ্ট অনুধাবনের প্রয়োজনে পোস্টটি আপডেট করা হতে পারে। আপনার মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ… 🙂

কমেন্ট করুন-