অনুলিখনইঃ টিপস এন্ড ট্রিক্সটিউটোরিয়ালতত্ত্বীয়পাওয়ার সাপ্লাই

SMPS বা সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই কিভাবে কাজ করে

SMPS বা সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই কিভাবে কাজ করে

SMPS (Switched Mode Power Supply) বা সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই এখন অনেক জনপ্রিয়। মূল কারণ এর অল্প আয়তন ও স্বল্প ওজনে উচ্চ ক্ষমতা এবং সেল্ফ স্টেবিলাইজেশন সিস্টেম (Self Stabilization System) এর কারনে। ইনপুট ভোল্ট প্রায় ১০০ ভোল্ট থেকে শুরু করে ২৭০ ভোল্ট পর্যন্ত যাই হোক না কেন আউটপুট ভোল্ট একদম নির্দিষ্ট যেমন দরকার ঠিক তাই দিতে পারে। অন্যান্য সব পাওয়ার সাপ্লাই এর মত এতেও ট্রান্সফরমার থাকে। কিন্তু এটি ফেরাইট কোর ট্রান্সফরমার। সাথে আরো সহযোগী কম্পোনেন্ট ও থাকে।

মূলত সুইচিং টেকনিক ব্যবহার করে এই সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই গুলো কাজ করে। এর জন্য প্রথমেই AC কে ব্রীজ রেক্টিফায়ার ও উপযুক্ত ফিল্টারিং ইন্ডাক্টর ও ক্যাপাসিটর দিয় DC করা হয়। তারপর এই উচ্চ ভোল্টেজের ডিসি কে সুইচিং সার্কিট দিয়ে উচ্চ কম্পাঙ্ক/ফ্রিকুয়েন্সি তে ট্রান্সফরমার টিকে চালনা করা হয়। আমরা সাধারন ভাবে মেইন লাইনে সরাসরি যে ট্রান্সফরমার ব্যবহার করি তা ৫০ হার্জ ফ্রিকুয়েন্সির হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে ব্যবহার করা হয় হাই ফ্রিকুয়েন্সি ট্রান্সফরমার। যা চপার বা ফেরাইট কোর ট্রান্সফরমার (Chopper/Ferrite Core Transformer) নামে পরিচিত। মুলত এই SMPS পদ্ধতিটি 1khz থেকে Ghz পর্যন্ত কার্যকরী হয়। তবে বেশীরভাগ smps পাওয়ার সাপ্লাই গুলো 18khz থেকে 30khz রেঞ্জের হয়ে থাকে৷ সাধারণত 2.5khz এর উপরে হলেই ফেরাইট কোরে ডিজাইন চিন্তা করা হয়৷ এই ইনপুট ফ্রিকুয়েন্সি এবং পালস ওয়াইডথ মডুলেশনকে (PWM) কমিয়ে-বাড়িয়ে আউটপুট ভোল্টেজ কে নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়। নিচের ব্লক ডায়াগ্রাম দেখলে আশাকরি বুঝতে পারবেন এর মূল কর্ম পদ্ধতি-

সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাইয়ের ব্লক ডায়াগ্রাম
সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাইয়ের ব্লক ডায়াগ্রাম

নিম্নে কিছু ফেরাইট কোরের চিত্র দেয়া হলোঃ

বিভিন্ন ধরনের ফেরাইট কোর
বিভিন্ন ধরনের ফেরাইট কোর

এত উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করা হয় মূলত ট্রান্সফরমার এর আকৃতি ও পাওয়ার লস কমানোর জন্য। পাওয়ার লস কম হলে এফিসিয়েন্সি বা দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ভোল্টেজ রেগুলেশন ও কম হয়। এছাড়াও এর অনেক সুবিধা আছে যা সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয়।

প্রকৃতপক্ষে যেকোন ট্রান্সফরমার এর ইনপুট ফ্রিকুয়েন্সি কে কমবেশি করে এর আউটপুট ভোল্টেজ কমবেশি করা সম্ভব। এই সূত্রের ওপর নির্ভর করে এই পাওয়ার সাপ্লাই গুলো ডিজাইন করা হয়। সাথে আরো কিছু সূক্ষ্ণ জটিলতা আছে বৈকি। এ সূত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের সাইটে প্রকাশিত ট্রান্সফরমার তৈরির কৌশল লেখাটি পড়তে পারেন।

একটা প্রশ্ন প্রায়ই শুনি যে এই SMPS সাপ্লাই গুলোতে কেন ফেরাইট কোর ব্যবহার করে তা নিয়ে। মূলত এই সাপ্লাই গুলো ফ্রিকুয়েন্সি বা সুইচিং নির্ভর। তাই এমন একটি কোর দরকার যা কিনা উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সিতেও সমান ভাবে কাজ করতে সক্ষম। আর তার জন্যই এই ফেরাইট কোর ব্যবহার করে। সাধারন আয়রন কোর মাত্র ২০ হার্জ থেকে ২০ কিলোহার্জ (অডিও রেঞ্জ) পর্যন্ত কাজ করতে পারে। তাও গুণগত মানের ভালো কোর হলে। সেক্ষেত্রে স্পট ওয়েল্ডিং করে দেওয়া হয় ভাইব্রেশন বা নয়েজ কমানোর জন্য। এর উপরে হলেই ফেরাইট কোর চিন্তা করতে হয় ৷ কিন্ত সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই এ দরকার আরো হাই ফ্রিকুয়েন্সি, তাই ব্যবহার করা হয় ফেরাইট কোর। উল্লেখ্য, টিভি তে ব্যবহৃত ফ্লাইব্যাক ট্রান্সফরমার কে ফেরাইট কোর দ্বারা নির্মাণ করা হয় ঠিক একই কারনে। টিভির ফ্লাইব্যাক সাধারণত ১৬৬২৫ হার্জে সুইচিং করা হয়। ডিজাইন ভেদে পার্থক্য হয়, 15625 থেকে 16625 Hz এর মধ্যেই ব্যবহার করা হয়। তবে বেশীর ভাগ ডিজাইনই 15625 Hz ব্যবহার করা হয়

এখন কেউ যদি মনে করেন যে SMPS এর এই ফেরাইট ট্রান্সফরমার টি খুলে নিয়ে মেইন লাইনে লাগালেই হয়ত চলবে -তা হলে সেটা মারাত্মক ভুল হবে। কারন আগেই বলেছি যে এই ফেরাইট কোর ব্যবহার করে হাই ফ্রিকুয়েন্সি তে। তাই একে সাধারন মেইন লাইনে সরাসরি লাগালে কাজ করবে না বরং ট্রান্সফরমার পুড়ে যাবে ও আরো অনেক ক্ষতিও হতে পারে। তাই ভুলেও এ কাজটি করা উচিত হবে না। নিচের চিত্রে আমরা কিছু ফেরাইট কোর ট্রান্সফরমার দেখতে পাচ্ছি-

বিভিন্ন রকম ফেরাইট কোর ট্রান্সফরমার বা চপার
বিভিন্ন রকম ফেরাইট কোর ট্রান্সফরমার বা চপার

মূলত সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই এর জন্য চপার ট্রান্সফরমার যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর সুইচিং সার্কিট টি। একটি ছাড়া অপরটি চলতে পারে না। এর সার্কিট ডিজাইন করতে এই হয় চপার ট্রান্সফরমার এর ডিজাইন অনুযায়ী। তাই এমন ধরনের পাওয়ার সাপ্লাই ডিজাইন করা বেশ শ্রমসাধ্য ও জটিল হিসাব নিকাশে পূর্ণ। তবে আশার কথা হলো আমাদের ইলেকট্রনিক্সের গবেষক মণ্ডলী এ নিয়ে কাজ করছেন এবং কিছুদিনের মধ্যেই দেশীয় ভাবে প্রস্তুতকৃত এমন প্রযুক্তি আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করে পারবো বলে আশা করছি।  

এই ট্রান্সফরমার কে উচ্চ ফ্রিকুয়েন্সি তে সুইচিং করে চালনা করা হয়। আর এই ফ্রিকুয়েন্সি কে নিয়ন্ত্রণ করেই ট্রান্সফরমার এর আউটপুট কে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সাধারনত সেকেন্ডারি থেকে একটা ফিডব্যাক লাইন থাকে। সেকেন্ডারি ভোল্ট কমলে বা বাড়লে এই ভোল্টজের পার্থক্য টা ফিডব্যাক এর মাধ্যমে ফ্রিকুয়েন্সি কনট্রোলারে/আইসি তে যায়। যার মাধ্যমে অভন্তরস্থ অসিলেটরের পালস ওয়াইডথ নিয়ন্ত্রন হয় আর তার ফলে সেকেন্ডারি তে সাম্যবস্থা আনে।

নিচে কম্পিউটারে ব্যবহৃত এমন একটি সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই এর চিত্র দেয়া হলো।

প্রদত্ত চিত্রেঃ

কম্পিউটারে ব্যবহৃত সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই
কম্পিউটারে ব্যবহৃত সুইচ মোড পাওয়ার সাপ্লাই

A: ইনপুট EMI ফিল্টারিং; তার সাথেই ব্রীজ রেক্টিফায়ার;
B: ইনপুট ফিল্টার ক্যাপাসিটর;
C: ফেরাইট ট্রান্সফরমার;
D: আউটপুট ফিল্টার কয়েল;
E: আউটপুট ফিল্টার ক্যাপাসিটর সমূহ।

আসলে সুইচ মোড সাপ্লাইয়ের কথা ও কাজ বলে শেষ হবে না। আমাদের কম্পিউটার থেকে শুরু করে টিভি, ডিভিডি, সেট টপ বক্স ইত্যাদিতে এটি হরহামেশা ব্যবহার হচ্ছে। আশা করি সংক্ষেপে যা বললাম তা নতুন পুরানো সবার কাজে লাগবে। আজকের মত এ পর্যন্তই। সামনে আবারো নতুন কোনো লেখা নিয়ে হাজির হবো আপনাদের সাথে। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। আর অবশ্যই সাইটে কমেন্ট করে উৎসাহ দিবেন আমাদের লেখকদের। সবার জন্য শুভকামনা।

বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ Lutfur Rahman Babul

Tags

সৈয়দ রাইয়ান

ব্যবহারিক ইলেকট্রনিক্স, এনালগ ইলেকট্রনিক্স, নেটওয়ার্কিং, ফটোগ্রাফি, গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করি। মূলত ডেভলপমেন্ট রিলেটেড কাজই বেশী করা হয়। লেখালিখির একটা ঝোঁক আছে তবে অনেক সময় নিয়ে লিখতে হয়।লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট করবার পর ব্যক্তিগত জীবনে সফটওয়্যার ও আইটি সংক্রান্ত পেশায় ছিলাম বহু বছর। ইলেকট্রনিক্স ও ফটোগ্রাফি আমার আজন্ম একটি হবি ও সাধনা। তবে এখন খুব কম এসব নিয়ে ব্যবহারিক কাজ করা হয়। বেশীরভাগ সময় এখন আমাদের ইলেকট্রনিক্সের পেছনেই ব্যয় হয়।

Related Articles

11 Comments

  1. অামার পাওয়ার সাপ্লাইটা শর্ট হয়ে গেছে এসি কানেক্ট করলেই ব্রেকার পরে যাচ্ছে। কোন জায়গা থেকে শুরু করলে এটার সহজ একটা সমাধান করা যাবে।

    1. এসি লাইন ইন হবার একদম শুরুর দিকে ব্রীজ রেক্টিফায়ার, ক্যাপাসিটর, রেজস্টর এগুলো চেক করুন। সব ঠিক থাকলে আস্তে আস্তে ভেতরের গুলো চেক করতে হবে ও নষ্ট থাকলে পালটে দিতে হবে।
      সমস্যা হলে টেকনিশিয়ান এর কাছে নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।

  2. ধন্যবাদ
    একটি সার্কিট ডায়াগ্রাম দিলে ভালো হতো ।
    12v এর জন্য ট্রান্সফরমারের সাইজ কত হবে?

  3. আপনাদের এই উদ্যোগ আমরা বিগিনারদের জন্য অনেক উপকারে আসবে।কারন বাংলায় লেখা আর্টিকেল গুলো পড়ে বুঝতে খুব সুবিধা হয়।আশা করি এভাবেই আমাদের সাহায্য করে যাবে।

    1. খুব সুন্দর হয়েছে এবং এই ওয়েব সাইটির সকল লেখা গুলো খুবই সুন্দর এবং শিক্ষনীয়৷ তাই আপনাদের সবার জন্য আমার তরফ থেকে দোয়া এবং শুভকামনা রইল৷

      1. আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি তানিম ও বাহাউদ্দিন ববি কে। সুন্দর উৎসাহ ব্যঞ্জক কমেন্ট একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি 🙂

কমেন্ট করুন-

Back to top button
Close
%d bloggers like this: