ইলেকট্রিক্যাল মেশিন কী — মোটর, জেনারেটর এবং ইন্ডাকশন সম্পূর্ণ গাইড

    17
    22609
    মোটর, জেনারেটর এবং মেশিন এর খুঁটিনাটি
    মোটর, জেনারেটর এবং মেশিন এর খুঁটিনাটি

    সূচনাঃ

    বাস্তব জীবনে আমরা “মেশিন” কথাটি অনেকাংশে ব্যবহার করি ঠিকই কিন্তু সবাই জানি না আসলে এই মেশিন শব্দটির সঠিক বৈজ্ঞানিক অর্থ কি। তাছাড়া জেনারেটর বা মোটর নিয়ে আমরা দিনের অনেকাংশ সময় কাটিয়ে দেই, যা কিনা প্রকৃতপক্ষে মেশিন। কিন্তু জানা নেই কিভাবে এগুলো কাজ করে। এর পিছনে এমন কি আছে যার ফলে কারেন্ট চলে গেলে আমরা ঘরেই কারেন্ট তৈরি করে আবার আগের মত সব কিছু চালাতে পারছি। এই যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে মাটির অভ্যন্তর থেকে মুহূর্তের মধ্যে পানি তুলতে পারছি। কিন্তু একবারও কি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন এদের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে? আজকে ইলেকট্রিক্যাল শর্ট নোট এর মাধ্যমে জেনে নেই এসমস্ত টুকিটাকি বিষয়গুলো। সেই সাথে ডিসি জেনারেটরের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অংশ ও এর গঠন প্রণালি সম্পর্কে জানবো।

    “মেশিন” বলতে আসলে কী বোঝায়?

    আমরা প্রতিদিন “মেশিন” শব্দটা ব্যবহার করি।

    কিন্তু ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মেশিনের একটি নির্দিষ্ট অর্থ আছে।

    মেশিন মানে শুধু যন্ত্রপাতির সমাহার নয়। মেশিন মানে এমন একটি ব্যবস্থা যা এক ধরনের শক্তিকে অন্য ধরনের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।

    ইলেকট্রিক্যাল মেশিন বিশেষভাবে দুটি কাজ করে:

    বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে — এটা মোটর।

    যান্ত্রিক শক্তিকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তর করে — এটা জেনারেটর।

    এই দুটির পিছনে একই পদার্থবিজ্ঞান কাজ করে। শুধু শক্তির দিক উল্টো।

    মেশিন বা যন্ত্রের সংজ্ঞা অনেকটা এরকম- “নির্দিষ্ঠ কার্যদ্ধার কল্পে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে যে যান্ত্রিক বস্তু তৈরি করাহয় তাকেই মেশিন বা যন্ত্র বলে। এই সংজ্ঞা থেকে কিছু জিনিস বুঝতে পারলাম, যেমনঃ একটি মেশিনে কিছু যন্ত্রাংশ থাকে। এই যন্ত্রপাতি গুলোই মেশিন টিকে চালায় এবং এটি একটি নির্দিষ্ঠ কাজ করতে সক্ষম। মেশিন যেমন ইলেকট্রিক্যাল হতে পারে তেমনি মেকানিক্যাল ও হতে পারে। নিচে একটি সরল মেকানিক্যাল মেশিন পুলি ও এর দ্বারা কিভাবে কাজ করা হয় তা দেখানো হলো-

    সরল মেশিন (যন্ত্র) পুলি ব্যবহার করে কোনো ভারোত্তোলন সহজ হয়
    সরল মেশিন (যন্ত্র) পুলি ব্যবহার করে কোনো ভারোত্তোলন সহজ হয়

    ইলেকট্রিক্যাল মেশিন কি?

    ইলেকট্রিক্যাল মেশিন এ পাওয়ার এর রূপান্তর
    ইলেকট্রিক্যাল মেশিন এ পাওয়ার এর রূপান্তর

    সহজ কথায় ইলেকট্রিক্যাল মেশিন হলো এমন একটি যান্ত্রিক পদ্ধতি যা কিনা ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ারকে মেকানিক্যাল এনার্জি তে অথবা মেকানিক্যাল পাওয়ার কে ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি তে রূপান্তর করতে পারে। এখন ইলেকট্রিক্যাল মেশিন নিয়ে আরেকটু পরিষ্কার হওয়ার জন্য আমরা মোটর নিয়ে আলোচনায় এগিয়ে যাই-

    মোটর কীভাবে কাজ করে?

    মোটরে বিদ্যুৎ দিলে শ্যাফট ঘোরে।

    এই শ্যাফটের সাথে পাম্প লাগালে পানি ওঠে। ফ্যান লাগালে বাতাস আসে। কম্প্রেসর লাগালে এসি ঠান্ডা করে।

    মূল নীতিটা হলো ফ্লেমিংয়ের বাঁ হাতের নিয়ম। কারেন্ট বহনকারী কোনো পরিবাহী চৌম্বকক্ষেত্রে রাখলে সেটির উপর একটি বল তৈরি হয়। এই বলই ঘূর্ণন তৈরি করে।

    বাস্তব উদাহরণ: বাসার পানির পাম্প একটি AC ইন্ডাকশন মোটর। সিলিং ফ্যানও তাই। ব্লেন্ডার বা মিক্সচার গ্রাইন্ডার সাধারণত ইউনিভার্সাল মোটর। ইলেকট্রিক গাড়ি চলে DC ব্রাশলেস মোটরে।

    মোটর কত প্রকার?

    প্রধানত দুটি শ্রেণি:

    AC মোটর — বাসার সাপ্লাই থেকে সরাসরি চলে। সিলিং ফ্যান, পানির পাম্প, ওয়াশিং মেশিন, রেফ্রিজারেটর কম্প্রেসর — সব AC মোটর।

    DC মোটর — ব্যাটারি বা DC পাওয়ার সাপ্লাই থেকে চলে। ইলেকট্রিক গাড়ি, ড্রোন, রোবোটিক আর্ম, কর্ডলেস ড্রিল — DC মোটর।

    AC বনাম DC মোটর — কোনটা কোথায় ব্যবহার হয়?

    AC মোটর সস্তা, টেকসই, রক্ষণাবেক্ষণ কম লাগে। তবে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে ভেরিয়েবল ফ্রিকুয়েন্সি ড্রাইভ (VFD) লাগে।

    DC মোটর গতি নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ। বেশি শক্তিদক্ষ। তবে ব্রাশযুক্ত DC মোটরে ব্রাশ ক্ষয় হয়, পরিবর্তন করতে হয়।

    DC সিলিং ফ্যান AC ফ্যানের তুলনায় প্রায় ৭০% কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে একই বায়ুপ্রবাহে। তবে দাম বেশি। বাংলাদেশে লোডশেডিং প্রবণ এলাকায় সোলার ব্যাটারি সিস্টেমে DC ফ্যান কার্যকর।

    জেনারেটর কীভাবে কাজ করে?

    জেনারেটর মোটরের উল্টো।

    শ্যাফট ঘোরালে বিদ্যুৎ তৈরি হয়।

    মূলনীতি ফ্যারাডের তড়িচ্চৌম্বকীয় আবেশ, যা ১৮৩১ সালে আবিষ্কৃত। কোনো পরিবাহী চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে গতিশীল হলে সেই পরিবাহীতে বিদ্যুৎ তৈরি হয়।

    এই শ্যাফট ঘোরানোর কাজটা করে ইঞ্জিন। ডিজেল জেনারেটরে ডিজেল ইঞ্জিন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্টিম টারবাইন বা গ্যাস টারবাইন ইঞ্জিন। সৌর শক্তিতে এই ঘূর্ণন নেই বলে ইনভার্টার লাগে আলাদা।

    তড়িচ্চৌম্বকীয় আবেশ বা ইন্ডাকশন — মোটর ও জেনারেটর দুটোর ভিত্তি

    এই একটি নীতিই সব কিছু চালায়।

    চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে কোনো পরিবাহী নড়লে সেখানে ভোল্টেজ তৈরি হয়।

    উল্টোটাও সত্য — পরিবাহীতে কারেন্ট দিলে এবং চৌম্বকক্ষেত্র থাকলে সেই পরিবাহী নড়তে চায়।

    প্রথমটা ব্যবহার করা হয় জেনারেটরে। দ্বিতীয়টা ব্যবহার করা হয় মোটরে।

    একটি ইলেকট্রিক্যাল মেশিন এই কারণে মোটর এবং জেনারেটর — দুটো হিসেবেই কাজ করতে পারে। শুধু শক্তির দিক বদলে দিতে হয়।

    তড়িৎচুম্বক কীভাবে তৈরি হয়?

    লোহার দণ্ডের চারপাশে তার পেঁচিয়ে কারেন্ট দিলে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়।

    কারেন্ট বন্ধ করলে চৌম্বকত্বও চলে যায়।

    এই নিয়ন্ত্রণযোগ্য চৌম্বকত্বই ইলেকট্রিক্যাল মেশিনকে কার্যকর করে। পার্মানেন্ট ম্যাগনেটে এটা সম্ভব নয়।

    মোটরের স্টেটরে এই তড়িৎচুম্বকগুলো থাকে। রোটর ঘোরানোর জন্য এগুলো ক্রমান্বয়ে চালু-বন্ধ হয়।

    একটি DC জেনারেটরের ভেতরে কী আছে?

    একটি ডিসি জেনারেটর মেশিন এর বিভিন্ন আভ্যন্তরীন অংশ
    একটি ডিসি জেনারেটর মেশিন এর বিভিন্ন আভ্যন্তরীন অংশ

    DC জেনারেটরের প্রধান অংশগুলো এক এক করে বোঝা যাক।

    ইয়োক হলো বাইরের আবরণ। ছোট জেনারেটরে কাস্ট আয়রন, বড়গুলোতে স্টিল। এটা কাঠামো দেওয়ার পাশাপাশি চৌম্বক পরিবাহক হিসেবেও কাজ করে।

    ফিল্ড ম্যাগনেট বা স্ট্যাটর ম্যাগনেট এর দুটো অংশ — পোল কোর ও পোল শ্যু। পোল শ্যুর কাজ হলো ভেতরের জায়গায় চৌম্বকক্ষেত্র সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।

    ফিল্ড ওয়াইন্ডিং ও পোল কয়েল তামার তার দিয়ে তৈরি। প্রতিটি পোলে পেঁচানো থাকে। এগুলোতে কারেন্ট দিলে স্ট্যাটর ম্যাগনেট তড়িৎচুম্বক হয়ে ওঠে।

    আর্মেচার কোর ঘোরার অংশ। সিলিন্ডার আকৃতির, তামার কন্ডাক্টর পেঁচানো। এই কন্ডাক্টরগুলো চৌম্বকক্ষেত্রে ঘুরে বিদ্যুৎ তৈরি করে।

    কমিউটেটর গোলাকার, বিয়ারিংয়ের মতো দেখতে। আর্মেচারে তৈরি হওয়া AC কারেন্টকে DC-তে রূপান্তরের মূল কাজটা এখানে হয়।

    ব্রাশ কার্বন বা গ্রাফাইটের তৈরি। কমিউটেটরের সাথে সংযুক্ত থেকে বাইরের সার্কিটে কারেন্ট পৌঁছে দেয়। এটি ক্ষয়যোগ্য অংশ — নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন করতে হয়।

    ব্রাশ ড্রপ হলো ব্রাশের কারণে সামান্য ভোল্টেজ কমে যাওয়া। সাধারণত ১–২ ভোল্টের বেশি হয় না। এটা স্বাভাবিক।

    স্লিপ রিং কমিউটেটরের সাথে সংযুক্ত। AC জেনারেটরে (অল্টারনেটর) ব্রাশের পরিবর্তে স্লিপ রিং ব্যবহার হয়।

    DC জেনারেটর বনাম AC জেনারেটর (অল্টারনেটর) — পার্থক্য কোথায়?

    বাসায় ব্যবহার হওয়া পোর্টেবল জেনারেটর আসলে AC জেনারেটর বা অল্টারনেটর।

    DC জেনারেটর ব্যবহার হয় ব্যাটারি চার্জিং, ওয়েল্ডিং, শিল্পক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োগে। গাড়ির চার্জিং সিস্টেমে অল্টারনেটর থাকে, এরপর রেকটিফায়ার দিয়ে DC-তে রূপান্তর করা হয়।

    বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সবই AC জেনারেটর ব্যবহার করে। কারণ AC ভোল্টেজ ট্রান্সফরমার দিয়ে সহজে পরিবর্তন করা যায়। দূরে পাঠানো সহজ হয়।

    মোটর কেনার আগে যা জানতে হয়

    বাংলাদেশে পানির পাম্প কেনার সময় সবচেয়ে বেশি ভুল হয় ওয়াট রেটিং নিয়ে।

    মোটরের নেমপ্লেটে তিনটি তথ্য দেখুন:

    ভোল্টেজ রেটিং — ২২০V লাইনে ২২০V মোটর কিনুন।

    পাওয়ার ফ্যাক্টর — পাম্প মোটরে সাধারণত ০.৭৫–০.৮৫।

    রেটেড কারেন্ট — এটা দিয়ে MCB বা ফিউজের সাইজ নির্ধারণ করুন।

    ইন্ডাকশন মোটর স্টার্টের সময় রেটেড কারেন্টের ৫–৭ গুণ পর্যন্ত কারেন্ট টানে। এজন্য MCB সাইজ বের করার সময় এটা হিসেবে রাখুন।

    সমাপ্তিঃ

    মোটর আর জেনারেটর দেখতে ভিন্ন, কিন্তু ভেতরের পদার্থবিজ্ঞান একই।

    একটা শক্তিকে অন্য শক্তিতে রূপান্তর করে। এই রূপান্তরের দক্ষতা নির্ভর করে ডিজাইনের উপর।

    ডিজেল জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া থেকে শুরু করে সেই বিদ্যুৎ দিয়ে পাম্প চালানো পর্যন্ত — পুরোটাই একটা শক্তি রূপান্তর চেইন।

    এই চেইনটা বুঝলে যেকোনো বৈদ্যুতিক সমস্যার মূলে পৌঁছানো সহজ হয়।

    17 COMMENTS

    1. আপনার লেখা ভাল হয়েছে। আমি একটি বিষয় জানতে চাই। জেনারেটর এর তারবাইন কমপক্ষে কতো বার ঘুরলে বিদ্দুত উতিপাদন হবে? জানালে খুব খুশি হব।

    2. আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো লাগলে ‌ আপনাদের পোস্টগুলি।
      জেনারেটরের পোল ওয়েন্ডিং ও জেনারেটরের আর্মেচার এর ওয়েডিং ইমেজ আকারে অথবা ভিডিও আকারে আমাকে একটু বোঝানোর অনুরোধ জানাচ্ছি। আশা করি ছোট ভাইয়ের অনুরোধ রাখবেন। ধন্যবাদ আল্লাহ তায়ালা আপনাদের ভালো রাখুন সুস্থ রাখুন।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here